১৯৩০ বিশ্বকাপ: ফুটবল মহাযজ্ঞের আদিগন্ত ও প্রথম চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের জয়গাথা
ফুটবল আজ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, তবে এর বৈশ্বিক
মহাযজ্ঞ 'ফিফা বিশ্বকাপ'-এর সূচনা হয়েছিল আজ থেকে ৯৬ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার
ছোট্ট দেশ উরুগুয়েতে। ১৯৩০ সালের সেই প্রথম আসরটি ছিল নানা নাটকীয়তা, উত্তেজনা
এবং ইতিহাসের সাক্ষী। তিনটি প্রতিবেদনের তথ্যের আলোকে ইতিহাসের সেই প্রথম
বিশ্বকাপের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
পটভূমি ও আয়োজক নির্বাচনের নেপথ্য
ফুটবলকে অলিম্পিকের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন
আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের স্বপ্ন দেখেছিলেন ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে
রিমে এবং সেক্রেটারি হেনরি দেলাউনে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে বসে
বিশ্বকাপের প্রথম আসর। আয়োজক হিসেবে উরুগুয়েকে বেছে নেওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান
কারণ ছিল:
- দেশটি
১৯২৪ ও ১৯২৮ অলিম্পিক ফুটবলে সোনাজয়ী দল ছিল।
- ১৯৩০
সালে উরুগুয়ের সংবিধান প্রণয়নের শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছিল।
- অর্থনৈতিক
মন্দার (Great Depression) সেই সময়ে উরুগুয়ে অংশগ্রহণকারী সব দলের যাতায়াত ও আবাসনের খরচ বহন এবং নতুন স্টেডিয়াম তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সময়ের সাথে যুদ্ধ এবং এস্তাদিও
সেন্তেনারিও
টুর্নামেন্টের মাত্র এক বছর আগে আয়োজনের দায়িত্ব পেয়ে
উরুগুয়েকে মাঠ তৈরিতে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। শ্রমিকরা দিনরাত কাজ
করেও টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বিখ্যাত 'এস্তাদিও সেন্তেনারিও' পুরোপুরি
প্রস্তুত করতে পারেননি। এমনকি টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পাঁচ দিন পর গ্যালারি
পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েছিল。 শ্রমিকরা
দক্ষিণ আমেরিকার শীতের বৃষ্টি ও বাতাস উপেক্ষা করে এই বিশাল স্টেডিয়ামটি নির্মাণ
করেছিলেন。
অংশগ্রহণকারী দেশ ও আটলান্টিকের
দুঃসাহসী যাত্রা
প্রথম বিশ্বকাপে কোনো বাছাইপর্ব ছিল না; আমন্ত্রিত ১৩টি দেশ
এতে অংশ নেয়।
- অংশগ্রহণকারী
দেশ:
দক্ষিণ আমেরিকা (৭), উত্তর আমেরিকা (২) এবং ইউরোপ (৪)。
- ইউরোপের
উপস্থিতি:
অর্থনৈতিক মন্দা ও দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কারণে অনেক ইউরোপীয় দেশ অংশ নিতে
চায়নি। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স, রোমানিয়া, বেলজিয়াম ও যুগোস্লাভিয়া ‘কোন্তে
ভার্দে’ নামক বাষ্পচালিত জাহাজে চড়ে তিন সপ্তাহ পাড়ি দিয়ে উরুগুয়ে
পৌঁছায়। ফিটনেস ধরে রাখতে খেলোয়াড়রা জাহাজের ডেকের ওপরই দৌড়াতেন।
- দুর্ভাগা
মিসর: ঝড়ের
কবলে পড়ে কানেক্টিং জাহাজ মিস করায় আফ্রিকার একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে
মিসরের আর খেলা হয়নি。
মাঠের লড়াই ও প্রথম গোল
১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই ফ্রান্স ও মেক্সিকোর ম্যাচের মধ্য দিয়ে
বিশ্বকাপের পর্দা ওঠে。 খেলার ১৯
মিনিটে মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলদাতার গৌরব
অর্জন করেন ফ্রান্সের লুসিঁয়ে লরাঁ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জিম ডগলাস
প্রথম 'ক্লিনশিট' রাখার রেকর্ড গড়েন。 সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা যুক্তরাষ্ট্রকে এবং উরুগুয়ে
যুগোস্লাভিয়াকে একইভাবে ৬-১ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে。
দুই বলের বিতর্কিত ফাইনাল
৩০ জুলাই ১৯৩০ তারিখে মন্টেভিডিওতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে মুখোমুখি
হয় দুই প্রতিবেশী দেশ আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। ফাইনালটি ছিল নানা নাটকীয়তায়
ভরা:
- বল
বিতর্ক: দুই
দেশই তাদের নিজস্ব বল দিয়ে খেলতে চাইছিল। সমাধান হিসেবে প্রথমার্ধে
আর্জেন্টিনার বল এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের (আকারে সামান্য বড়) বল দিয়ে
খেলার সিদ্ধান্ত হয়।
- ম্যাচ
চিত্র:
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে থাকলেও বিরতির পর উরুগুয়ে তাদের
নিজেদের বলে বিধ্বংসী হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে জয়লাভ
করে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
- নিরাপত্তা
ও আতঙ্ক:
ফাইনালের রেফারি জন ল্যাঞ্জেনাস জীবনবিমার নিশ্চয়তা ছাড়া মাঠে নামতে চাননি।
আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা খুনের হুমকি পেয়েছিলেন, বিশেষ করে তারকা খেলোয়াড়
লুইস মন্টি দুই পক্ষ থেকেই মৃত্যুর পরোয়ানা পেয়েছিলেন বলে জানা যায়。
ইতিহাসের শ্রেষ্ঠত্ব ও পরিসংখ্যান
- প্রথম
অধিনায়ক:
উরুগুয়ের ডিফেন্ডার হোসে নাসাজ্জি (দ্য গ্র্যান্ড মার্শাল) ছিলেন
বিশ্বকাপ জেতা প্রথম অধিনায়ক。
- শীর্ষ
গোলদাতা:
আর্জেন্টিনার গুইলার্মে স্টাবিলে ৮ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ
গোলদাতা হন।
- পুরস্কার: বিজয়ী দলকে দেওয়া হয়
'বিজয়ের দেবী' ট্রফি, যা পরে 'জুলে রিমে ট্রফি' নামে পরিচিত হয়।
বিশ্বকাপের শেষ সাক্ষী
২০১০ সালে আর্জেন্টিনার ফ্রান্সিসকো ভারালো ১০০ বছর
বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন ১৯৩০ বিশ্বকাপের মাঠের লড়াইয়ে অংশ নেওয়া শেষ
জীবিত খেলোয়াড়。
পরদিন উরুগুয়েতে জাতীয় ছুটি পালিত হয় এবং বর্ণিল আনন্দ উৎসব
চলে। অন্যদিকে, বুয়েনস এইরেসে নেমে আসে নিস্তব্ধতা আর ক্ষুব্ধ সমর্থকরা উরুগুয়ে
দূতাবাসে হামলা চালায়। এভাবেই শুরু হয়েছিল ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর, যা আজ
এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই