বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস
১৯০৪ সালের ২১ মে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন এবং সুইজারল্যান্ডের ফুটবল পরিচালনা কমিটির সদস্যগণ একত্রিত হয়ে ফেডারেল ইন্টারন্যাশনাল দে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সংক্ষেপে ফিফা প্রতিষ্ঠা করেন। জার্মানিও একই দিনে টেলিগ্রামের মাধ্যমে ফিফাতে যোগদান করলেও তাকে ফিফার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। তবে ব্রিটেনের কোন প্রতিনিধি এতে যোগদান করেনি। ইংল্যান্ড অবশ্য পরে ১৯০৫ সালের ১৪ এপ্রিল এতে যোগ দেয়। ১৯০৪ সালের ২৩ শে মে ফ্রান্সের রবার্ট গুরিন (তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর) ফিফা কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তিনি দু'বছর এই পদে বহাল ছিলেন।
সভায় স্থির হয় যে কেবলমাত্র ফিফা-ই ফুটবলের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারবে। তবে এখন (১৯০৪) থেকে পরবর্তী ২৬ বছর তারা ঐ প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে পারবে না।
১৯০৯ সালে প্রথম অ-ইউরোপীয় দেশ হিসাবে দক্ষিন আফ্রিকা ফিফাতে যোগ দেয়। আর্জেন্টিনা এবং চিলি ১৯১২ সালে আর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে ১৯১৩ সালে ফিফাতে যোগদান করে।
১৯০৬ সালে সুইজারল্যান্ডে অলিম্পিকের বাইরে ভিন্ন একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ফিফা। এরপর ১৯০৮ সালের অলিম্পিকে ফুটবল প্রথম বারের মত আনুষ্ঠানিক খেলার মর্যাদা পায়।
অলিম্পিকে অপেশাদার দলসমূহের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলার পাশাপাশি স্যার থমাস লিপটন ১৯০৯ সালে ইতালির তুরিনে স্যার থমাস লিপটন ট্রফি নামে একটি ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এটি ছিল বিভিন্ন দেশের ফুটবল ক্লাবগুলিকে নিয়ে একটি চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্ট। এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকটি দল আলাদা আলাদা দেশের প্রতিনিধিত্ব করায় অনেকেই এটিকে প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল বলে থাকেন। এই টুর্নামেন্টে পশ্চিম অকল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়।
১৯১৪ সালে ফিফা অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অনুষ্ঠিত ফুটবল প্রতিযোগিতাকে "অপেশাদার বিশ্ব ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ" হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি হয় এবং এই প্রতিযোগিতা পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এর ফলে ১৯২০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে বিশ্বের প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মিশর ও তেরটি ইউরোপীয় দল অংশ নেয়। আর এই অলিম্পিকে স্বর্ণ পদক জয় করে বেলজিয়াম।
১৯২৪ সাল থেকে ফিফা পেশাদার যুগ শুরু করে।
![]() |
| চিত্র: ফিফার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে |
১৯২১ সালে ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলে রিমে ফিফা’র তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি অলিম্পিকে বিভিন্ন দেশের সাফল্য দেখে উজ্জীবিত হয়ে একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করার চিন্তা করেন। তাকেই বিশ্বকাপ ফুটবলের জনক বলা হয়।
১৯২৮ সালে অলিম্পিকের বাইরে আলাদা ভাবে ফিফা নিজস্ব আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯২৮ সালে সর্বপ্রথম আর্সেনাল ক্লাব খেলোয়াড়দের সহজে চেনার জন্য খেলোয়াড়ের পোশাকে নম্বর বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় স্বাগতিক দলের জার্সি নম্বর থাকত ১-১১ পর্যন্ত আর সফরকারী দলের খেলোয়াড়দের নম্বর থাকত ১২-২২ পর্যন্ত। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে সিদ্ধান্ত হয় যে একই নম্বর বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রাও নিতে পারবে তবে নম্বর ঐ ১-২২ পর্যন্ত থাকতে হবে। ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম জার্সিতে খেলোয়াড়ের নাম লেখা হয় এবং কোন খেলোয়াড় যেকোন নম্বর নিতে পারবে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
![]() |
| চিত্র: উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে অবস্থিত এস্তাদিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়াম, এখানেই ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। |
অনেক কাঠখড় পুড়ানোর পর ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে প্রথম বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের আয়োজন করার দায়িত্ব পায়। মোট ১৩ টি দেশ এই টুর্নামেন্টের যোগদান করে। আর এভাবেই বিশ্বকাপ ফুটবলের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৩০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ৯৩ হাজার দর্শকের সামনে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয় স্বাগতি উরুগুয়ে।
আরো পড়ুনঃ ১৯৩০ বিশ্বকাপ
সেই থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়নি।
১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে প্রথম কোন ব্রিটিশ দল অংশগ্রহণ করে। ব্রিটিশ দলগুলি ১৯২০ সাল থেকে ফিফাকে বয়কট করে আসছিল। এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড অংশ নেয়। আর এই বিশ্বকাপ থেকেই বিশ্বকাপ ট্রফিকে জুলে রিমে ট্রফি হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। এই বিশ্বকাপে ভারত অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েও নাম প্রত্যাহার করে নেয়।
১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ প্রথম টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। বর্তমানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ মানুষ সরাসরি টেলিভিশনে বিশ্বকাপ খেলা দেখে থাকে।
![]() |
| চিত্র: ১৯৭০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দল |
১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয় বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় নিয়মানুযায়ী জুলেরিমে কাপ স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেয়। তবে পরবর্তীতে চোর কাপটি চুরি করে নেয় এবং তা গলিয়ে বিক্রি করে দেয়।
২০১৮ বিশ্বকাপ পর্যন্ত মোট ২০ টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৭৯ টি দেশ চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। আর তাতে মাত্র ৮ টি দেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছে।
এক নজরে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর সমূহ ঃ
|
বছর |
আয়োজক |
ফাইনাল |
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলা |
||||
|
চ্যাম্পিয়ন |
ফলাফল |
রানার-আপ |
তৃতীয় স্থান |
ফলাফল |
চতুর্থ স্থান |
||
|
১৯৩০ |
উরুগুয়ে |
উরুগুয়ে |
৪–২ |
আর্জেন্টিনা |
যুক্তরাষ্ট্র ও যুগোস্লাভিয়া |
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলা ছিল না |
|
|
১৯৩৪ |
ইতালি |
ইতালি |
২–১ |
চেকোস্লোভাকিয়া |
জার্মানি |
৩–২ |
অস্ট্রিয়া |
|
১৯৩৮ |
ফ্রান্স |
ইতালি |
৪–২ |
হাঙ্গেরি |
ব্রাজিল |
৪–২ |
সুইডেন |
|
১৯৪২ |
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
কারনে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়নি। |
||||||
|
১৯৪৬ |
|||||||
|
১৯৫০ |
ব্রাজিল |
উরুগুয়ে |
ফাইনাল ছিল না |
ব্রাজিল |
সুইডেন |
স্পেন |
|
|
১৯৫৪ |
সুইজারল্যান্ড |
পশ্চিম জার্মানি |
৩–২ |
হাঙ্গেরি |
অস্ট্রিয়া |
৩–১ |
উরুগুয়ে |
|
১৯৫৮ |
সুইডেন |
ব্রাজিল |
৫–২ |
সুইডেন |
ফ্রান্স |
৬–৩ |
পশ্চিম জার্মানি |
|
১৯৬২ |
চিলি |
ব্রাজিল |
৩–১ |
চেকোস্লোভাকিয়া |
চিলি |
১–০ |
যুগোস্লাভিয়া |
|
১৯৬৬ |
ইংল্যান্ড |
ইংল্যান্ড |
৪–২ |
পশ্চিম জার্মানি |
পর্তুগাল |
২–১ |
সোভিয়েত ইউনিয়ন |
|
১৯৭০ |
মেক্সিকো |
ব্রাজিল |
৪–১ |
ইতালি |
পশ্চিম জার্মানি |
১–০ |
উরুগুয়ে |
|
১৯৭৪ |
জার্মানি |
পশ্চিম জার্মানি |
২–১ |
নেদারল্যান্ড |
পোল্যান্ড |
১–০ |
ব্রাজিল |
|
১৯৭৮ |
আর্জেন্টিনা |
আর্জেন্টিনা |
৩–১ |
নেদারল্যান্ড |
ব্রাজিল |
২–১ |
ইতালি |
|
১৯৮২ |
স্পেন |
ইতালি |
৩–১ |
পশ্চিম জার্মানি |
পোল্যান্ড |
৩–২ |
ফ্রান্স |
|
১৯৮৬ |
মেক্সিকো |
আর্জেন্টিনা |
৩–২ |
পশ্চিম জার্মানি |
ফ্রান্স |
৪–২ |
বেলজিয়াম |
|
১৯৯০ |
ইতালি |
পশ্চিম জার্মানি |
১–০ |
আর্জেন্টিনা |
ইতালি |
২–১ |
ইংল্যান্ড |
|
১৯৯৪ |
যুক্তরাষ্ট্র |
ব্রাজিল |
০–০ |
ইতালি |
সুইডেন |
৪–০ |
বুলগেরিয়া |
|
১৯৯৮ |
ফ্রান্স |
ফ্রান্স |
৩–০ |
ব্রাজিল |
ক্রোয়েশিয়া |
২–১ |
নেদারল্যান্ড |
|
২০০২ |
দক্ষিণ কোরিয়া |
ব্রাজিল |
২–০ |
জার্মানি |
তুরস্ক |
৩–২ |
দক্ষিণ কোরিয়া |
|
২০০৬ |
জার্মানি |
ইতালি |
১–১ |
ফ্রান্স |
জার্মানি |
৩–১ |
পর্তুগাল |
|
২০১০ |
দক্ষিণ আফ্রিকা |
স্পেন |
১–০ |
নেদারল্যান্ডস |
জার্মানি |
৩–২ |
উরুগুয়ে |
|
২০১৪ |
ব্রাজিল |
জার্মানি |
১–০ |
আর্জেন্টিনা |
নেদারল্যান্ডস |
৩–০ |
ব্রাজিল |
|
২০১৮ |
রাশিয়া |
ফ্রান্স |
৪-২ |
ক্রোয়েশিয়া |
বেলজিয়াম |
২-০ |
ইংল্যান্ড |




কোন মন্তব্য নেই